।। মো: শমসের উদ্দিন (মিস্টার) ।। পৃথিবীর শুভালগ্নের পর থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন জ্ঞানীজনের মতে পৃথিবী সৃষ্টির মূল উপাদান হচ্ছে প্রেম। নিঃসন্দেহে তাঁদের মত উপেক্ষিত নয়। পৃথিবীর প্রথম মানব আদী পিতা হযরত আদম (আঃ) বেহেশতের সুখান্দ ময় শীতল হাওয়ায় থেকেও হযরত হাওয়া (আ) এর প্রেমে মুগদ্ধ হন অতঃপর তাকে খুশী করার জন্য নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের অপরাধ করেন। নিশ্চয় ইহার পিছনে মহান রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছা ছিল। কিন্তু মানুষ হিসেবে তার হৃদয় জুড়ে হাওয়ার প্রেমের অস্তিত্ব আন্দোলিত করেছিল।
প্রেমের সর্ম্পক নিঃশ্বাসের সঙ্গে নয়, আত্মায় সাথে, অনুভুতির সাথে। ১৪ই ফেব্রুয়ারীকে ভালবাসা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এই ভালবাসা দিবসটি আসলে প্রাচীন রোমের ধর্ম যাজকের মৃত্যুর দিন। তার নাম St. Valentine। এই ধর্ম যাজকের মৃত্যুর দিবস হিসেবে ও তার নামানুসারে আজকের এই ভালবাসার দিবস বা Valentine’s Day. 269 AD প্রাচীন রোমের ক্ষমতাধর রাজা ক্লোডিয়াস নিজের ক্ষমতাকে স্থায়ী করতে তার সৈন্যদল বৃদ্ধি করার জন্য নিজ দেশে বিবাহ বন্ধন নিষিদ্ধ করে ছিল। সৈন্যবাহীরা যেন পারিবারিক মোহে আবদ্ধ হতে না পারে সেই জন্য ছিল এই নিষ্ঠুর আইন। এই জন্যই তাকে Claudius the cruel বলা হত।
ক্লোডিয়াসের বিরুদ্ধে সেই সময়কার ধর্ম যাজক যুবক St. Valentine তার এক নিকট বন্ধুর সাহায্যে তৎকালিন প্রেমীক যুগলদের গোপনে বিয়ে করাতে শুরু করলেন। একদিকে বিবাহিত দাম্পত্তির সংখ্যা বাড়তে লাগল অন্য দিকে বাড়তে লাগল St. Valentine এর জনপ্রিয়তা। আর এই মহৎ কাজটির বিপক্ষে কাল হয়ে দাড়ালো রাজা ক্লোডিয়াস। রাজা সেই মহান ব্যক্তিকে গ্রেফতার করল এবং তার মৃত্যু দন্ডাদেশ জারী করল। বিধির বিধান সকল আইনের উপরে। জেল খানায় থাকাবস্থায় St. Valentine সেই জেল সুপারের সুন্দরী কন্যার প্রেমে মুগ্ধ হলেন। মেয়েটিও হৃদয়ের চক্ষু দ্বারা St. Valentine এর প্রেমকে উপলব্ধি করতে লাগলো। কারণ মেয়েটি সুন্দরী হলেও ছিল অন্ধ। দুজনে সকল বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে একে অপরের প্রেমে বিভোর। কিন্তু মিলন ছিলো অসম্ভব। ১৪ই ফেব্রুয়ারী ২৭০ AD এর দিন ধার্য্য হল সেই মহান ধর্ম যাজকের জীবনের শেষ দিন হিসেবে। তার মৃত্যু ঘটানো হল। মেয়েটির উদ্দেশ্যে লেখা তার শেষ চিঠিতে লেখা ছিল From your valentine অর্থাৎ তোমারই ভ্যালেন্টাইন।
৪৯৬ AD এর রোমের পোপ জিলিয়াস St. Valentine এর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে তার মৃত্যুর দিবস অর্থাৎ ১৪ই ফেব্রুয়ারীকে Valentine Day হিসেবে ঘোষণা করেন।
St. Valentine এর মহতি ভূমিকা ও তার আত্মত্যাগকে আজ আমরা না জেনে ভালবাসার নামে উচ্ছৃঙ্খল ও অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়ে সভ্য আধুনিকতার পরিচয় দেয়ার প্রয়াস চালাচ্ছি। ভালবাসা শুধু ১৪ই ফেব্রুয়ারীর জন্য সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে তাহলে আমি এই ভালবাসাকে মানি না। কারণ ভালবাসা কোন দিন-ক্ষনের জন্য সীমাবদ্ধ নয় বরং এটা প্রতিটি মুহুর্তের জন্য। ভালবাসা কোন অসামাজিক কাজে লিপ্ত হওয়ার নামে আবদ্ধ নয়। ইহার সম্পর্ক আত্মার ও বিশ্বাসের সাথে। ভালোবাসা শুধু প্রেমীক-প্রেমীকার জন্য নয়, আছে সবার জন্য।
আসুন না ফরমালিন যুক্ত ভালবাসা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে রক্ত ও অনুভুতির সাথে জড়িত থাকা ভালবাসার স্বাদ গ্রহণ করি। আমরা সবাই মিলে এই দিনটিকে পালন করি একটু ভিন্ন আঙ্গিকে। আমাদের ভালবাসাকে বিলিয়ে দেয় আমাদের গর্ভধারিনী মা ও স্বার্থহীন বাবার জন্য। ভালবাসা বিহীন পড়ে থাকা সেই সব লোকদের জন্য যাদের কপালে দু মুঠো ভাত জোটেনা। তাদের জন্য যারা পারিবারিক মোহ উপেক্ষা করে দেশ ও জাতির সেবায় নিয়োজিত আছে। তাদের মাঝে আমরা আমাদের ভালবাসাটি বিলীন করে বিনিময়ে যে সুখ ও তৃপ্তি পাবো তা কোটি টাকাইও সম্ভব নয়।
নিজের দৃষ্টি ভঙ্গি পাল্টালেই, পুরো পৃথিবীটাই পাল্টানো সম্ভব বলে আমি আশাবাদি।
লেখক: সাংস্কৃতিক সম্পাদক, অনলাইন প্রেস ক্লাব, সৈয়দপুর।